প্রতিটি সন্তান আল্লাহর দেওয়া আমানত।
এই আমানত আপনি কীভাবে রক্ষা করছেন, সেটাই ঠিক করে দেবে আপনার সন্তান দ্বীনে কতটা মজবুত হবে, তার চরিত্র কেমন হবে এবং উম্মাহর মধ্যে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
ইসলামিক প্যারেন্টিং আসলে কী জিনিস?
অনেক মা-বাবা দুটো আচরণের মাঝে আটকা পড়ে যান। একদিকে অতিরিক্ত নরম, বাচ্চা যা চায় তাই দিচ্ছেন। অন্যদিকে এতটাই কড়া যে, সন্তান সবসময় ভয়ে থাকে, কিন্তু দ্বীনের প্রতি তার কোনো ভালোবাসা জন্মায় না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের দেখিয়ে গেছেন তৃতীয় একটা পথ, যেখানে থাকবে ভালোবাসা আর শৃঙ্খলার এক দারুণ মিশেল, স্বাধীনতা আর নির্দেশনার চমৎকার ব্যালেন্স।
এই পথের মূল কথাগুলো হলো সন্তানের স্বভাব বা ফিতরাহ রক্ষা করা। স্কুল বা মাদ্রাসায় শেখানোর আগেই ঘরের ভেতর আমলের পরিবেশ তৈরি করা। সন্তানের মনে এমন একটা সম্পর্ক তৈরি করা, যেন বিপদে পড়লে সে অন্য কোথাও যাওয়ার আগে সোজা আপনার কাছে আসে। এছাড়া সন্তান যেমনই হোক না কেন তার জন্য সব সময় মন খুলে দোয়া করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“প্রতিটি শিশু ফিতরাতের উপর জন্মায়, তারপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।” (সহিহ বুখারি ১৩৮৫, মুসলিম ২৬৫৮)
বাবা মা হিসেবে আপনার মূল কাজ হলো সেই ফিতরাতকে অবহেলা না করে সযত্নে রক্ষা করা।

নেক সন্তান গড়ার ১০টি মূলনীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সন্তান লালন-পালন নিয়ে যা শিখিয়ে গেছেন, তা আমাদের জন্য অন্যতম পথ প্রদর্শক। নিচের ১০টি নীতি সেই কোরআন ও সুন্নাহর আলো থেকে নেওয়া, যা আজকের ব্যস্ত দুনিয়াতেও সমান কার্যকর। এগুলো শুধু পড়বেন না — একটু একটু করে ঘরে চর্চা শুরু করুন। পরিবর্তন আসবেই, ইনশাআল্লাহ।
১. সর্বাগ্রে এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে অবিরাম দোয়া
কোনো স্পেশাল কৌশল বা প্যারেন্টিং টিপস নয়, শুরুটা করুন দোয়া দিয়ে। কোরআনে উল্লেখ আছে যে, ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য দুআ করে কাঁদতেন।
“হে আমার রব, আমাকে নেক সন্তান দান করো।” (সূরা সাফফাত, ৩৭:১০০)
সন্তান পাওয়ার পরেও তিনি থামেননি। আবারও দোআ করেছেন। বলেছেন:
“হে আমার রব, আমাকে নামাজ কায়েমকারী করো, আমার বংশ থেকেও। হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করো।” (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৪০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তিন ধরনের দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়, মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, আর সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া।” (ইবনে মাজাহ)
মনে রাখবেন, দোয়া হলো সরাসরি সেই মহান সত্তার সাথে আপনার আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করা, যিনি তার অসীম কুদরতি হাতে আপনার সন্তানের পরিবর্তনশীল হৃদয়টা খুব শক্ত করে ধরে আছেন। তাই সন্তানের কোনো আচরণে বিরক্ত হয়ে রাগ করার আগে, তাকে কঠোর ভাষায় বকা দেওয়ার আগে বা এমনকি তাকে কোনো ভালো পরামর্শ বা উপদেশ দেওয়ার আগেও, সবার আগে তার জন্য আল্লাহর কাছে হেদায়েতের দোয়া করুন।
২. কেবল কঠোর অভিভাবক নয়, হয়ে উঠুন আত্মার পরম সঙ্গী
সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিন। তাকে আদর করে কাছে ডাকুন, ভালোবাসার প্রকাশ করুন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন,
রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার তাঁকে উটের পেছনে বসিয়ে নিয়েছিলেন। পথে যেতে যেতে কথা বললেন। সেই কথাগুলোই তাঁর সারাজীবনের পথ দেখিয়েছে।
এটাই হলো আসল সাহচর্য, একসাথে থাকা, দরকারী কথাগুলো বলা আর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলা।
কোরআনে আছে, লোকমান (আ.) ছেলেকে ডাকতেন:
“হে আমার প্রিয় পুত্র…” (সূরা লোকমান, ৩১:১৩)
জ্ঞান দেওয়ার আগে বা কোনো কিছু বোঝানোর আগেই তাকে ভালোবাসা দিন। ভুল ধরার আগে তার সাথে কানেকশন তৈরি করুন। এটাই কোরআনের মডেল, আর এটাই আপনার ঘরে হওয়া দরকার।
৩. মহান আল্লাহ আর তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-কে গড়ে তুলুন ঘরের মূল প্রাণকেন্দ্র হিসেবে
সন্তানের ইসলামিক পরিচয় শক্ত করতে চাইলে, আল্লাহ আর তাঁর রাসূল ﷺ যেন ঘরের প্রতিটি মুহূর্তের অংশ হয়ে যান, সেটা খেয়াল রাখুন। বাবা মা হিসেবে ঘরের পরিবেশে যেনো ইসলামের প্রভাব থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
আল্লাহকে চেনান ভালোবাসা দিয়ে
বাচ্চাদের মনে আল্লাহর ভয় ঢোকানোর আগে তাঁর অসীম দয়া ও ভালোবাসার কথা জানিয়ে তাঁকে চেনান। উদাহরণস্বরূপ, আপনার বাচ্চা যখন অসুস্থ হয়ে কষ্টে ছটফট করে, তখন শুধু ওষুধের ওপর ভরসা না করে তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলুন,
“ভয় পেয়ো না বাবা, আল্লাহ তোমাকে খুব দ্রুত পূর্ণ শিফা বা সুস্থতা দেবেন, কারণ তিনি হলেন আর-রাহমান, পরম দয়ালু।”
প্রতিদিন একসাথে খাবার টেবিলে বসে যখন খাবার খাবেন, তখন সন্তানকে মনে করিয়ে দিন এবং বলুন,
“টেবিলের এই চমৎকার রিযিক বা খাবারগুলো কিন্তু আল্লাহ তায়ালাই আমাদের ভালোবেসে দিয়েছেন।”
দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোটবড় কাজে “আলহামদুলিল্লাহ” আর “বিসমিল্লাহ”-এর ব্যবহার যদি আপনাদের ঘরের শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক ও নিয়মিত একটি অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, তাহলে আপনার সন্তান আল্লাহকে চিনবে গভীর ভালোবাসা দিয়ে, কেবল জাহান্নামের ভয় থেকে নয়।
পবিত্র কোরআনের সূরা নিসায় আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
“তোমরা একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে অন্য কোনো কিছুকে বিন্দু পরিমাণও শরিক বা অংশীদার করো না, আর তোমাদের মা-বাবার সাথে সর্বদাই অত্যন্ত ভালো ও সদয় ব্যবহার করো।” (সূরা নিসা, ৪:৩৬)।
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, মানুষের ভেতরের তাকওয়া বা আল্লাহভীতির আসল বীজ রোপিত হয় এবং তার চর্চা শুরু হয় নিজের ঘর থেকেই। এটি জুম্মাবারে বা সপ্তাহে নির্দিষ্ট একদিনের কোনো তাত্বিক পড়া নয়, বরং এটি হলো মানুষের প্রতিদিনের জীবনের বাস্তব চর্চা।
নবীজি ﷺ-কে সন্তানের হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন:
রাতের খাবারের সময় নবীজির গল্প বলুন। কীভাবে তিনি হাসান-হুসাইনের সাথে খেলতেন, কীভাবে পশুর প্রতি মায়া দেখাতেন, কীভাবে অসুস্থ মানুষকে দেখতে যেতেন, কীভাবে সুন্দর করে হাসতেন। সীরাত যেন শুধু পাঠ্যবইয়ে আটকে না থাকে, সেটা হোক আপনাদের রোজকার গল্পের একটা অংশ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, বাবা এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।” (সহিহ বুখারি)
মনে রাখবেন, এই ভালোবাসা এমনি এমনি তৈরি হয় না, আপনাকেই যত্ন করে তৈরি করতে হবে।
৪. হালাল আনন্দের ব্যবস্থা করুন, তবে পরিবেশ সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব পুরোপুরি আপনার
ইসলাম কখনো বলেনি যে ঘর একদম আনন্দহীন বা গুমোট হতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ আয়েশা (রা.) এর সাথে দৌড় পাল্লা দিয়েছেন। হাসান-হুসাইন সিজদায় থাকার সময় তাঁর পিঠে চড়ে বসেছে। তিনি হাসতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমার ভাইয়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলাও একটা সদকা।” (তিরমিজি)
তবে আনন্দের পরিবেশটা কেমন, সেটা নিশ্চিত করা কিন্তু আপনার দায়িত্ব। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ডিজিটাল দুনিয়া। আপনার সন্তান যা দেখছে, যা খেলছে, যা স্ক্রোল করছে, সেটাই তার মূল্যবোধ গড়ে দিচ্ছে। অনেক সময় আপনার বলা কথার চেয়েও এর প্রভাব বেশি।
অনলাইনে সাইবার বুলিং, আজেবাজে কন্টেন্ট, অপরিচিতদের পাতা ফাঁদ, এসব থেকে সন্তানকে রক্ষা করা এই যুগে অভিভাবক হিসেবে আপনার বড় একটা দায়িত্ব।
আনন্দ অবশ্যই হালাল। কিন্তু সেই আনন্দের পরিবেশটা নিরাপদ কি না, সেটা নিশ্চিত করা আপনারই জিম্মাদারি।
শিশুর অনলাইন সুরক্ষায় Kahf Kids এর সহযোগিতা নিন।
৫. আপনিই সন্তানের রোল মডেল
সন্তান ইসলাম শেখে আপনাকে দেখে। আপনি যদি তাকে নামাজ পড়তে বলেন কিন্তু সে যদি আপনাকে কখনো জায়নামাজে না দেখে, তাহলে আপনার কথার কোনো ওজন থাকে না। আপনি সততার কথা লেকচার দিলেন কিন্তু নিজে মানলেন না, তাহলে সন্তানের কাছে সেই সততার কোনো মূল্য নাই। কারণ সন্তানের কাছে আপনিই আইডল।
আল্লাহ বলেছেন:
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা যা করো না তা কেন বলো? আল্লাহর কাছে এটা ভীষণ রাগের বিষয় যে তোমরা তা বলো যা তোমরা করো না।” (সূরা সাফ, ৬১:২-৩)
আয়েশা (রা.) কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চরিত্র কেমন ছিল। তিনি বলেছিলেন:
“তাঁর চরিত্রই ছিল কোরআন।” (সহিহ মুসলিম)
বাস্তবে উদাহরণ হওয়ার কিছু সহজ উপায় হলো:
সন্তানের সামনে নামাজ পড়ুন। ওযু করা, জায়নামাজ বিছানো, দাঁড়িয়ে পড়া, এই দৃশ্যগুলো তাদের মনে গেঁথে যাক। কঠিন সময়ে আফসোস না করে বলুন “আলহামদুলিল্লাহ।” সদকা করুন এবং তাকে বলুন কেন করছেন। নিজের ভুল হলে সন্তানের সামনেই অকপটে বলুন “আমি ভুল করেছি, আমাকে মাফ করে দিও।” আর নিজের রাগ সামলান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে জেতে, বরং সে যে রাগের সময় নিজেকে সামলাতে পারে।” (সহিহ বুখারি)
আপনি মুখে যা বলেন আর কাজে যা করেন, এই দুটোর মিল থাকলেই আপনার সন্তানের ইসলামের প্রতি আস্থা মজবুত হবে ইনশাআল্লাহ ।
৬. সন্তানের কাছের বন্ধু হোন, ত্রাস বা ভয়ের কোনো চরিত্র নয়
ভয় দেখিয়ে সম্মান আদায় করা আর মন থেকে শ্রদ্ধা করা, দুটো জিনিস কিন্তু এক নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“সে আমাদের দলের নয় যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া দেখায় না এবং আমাদের বড়দের মর্যাদা বোঝে না।” (তিরমিজি)
সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো মেশার মানে হলো, কথা বলার সময় তার মানসিক স্তরে নেমে আসা। তার পছন্দের বিষয়গুলোতে সত্যিকারের আগ্রহ দেখানো, তার সাথে মন খুলে হাসা। এমনভাবে কথা বলা যাতে সে অনুভব করে আপনার কাছে আসার দরজা সবসময় খোলা, কখনো বন্ধ হচ্ছে না। আপনি তাকে কেয়ার করেন।
যে সন্তান মা-বাবার কাছে মানসিকভাবে নিরাপদ অনুভব করে, সে বাইরের কোনো বিপদে পড়লে অন্য কোথাও না গিয়ে সবার আগে আপনার কাছেই ছুটে আসবে। আজকে আপনি তাকে যে উষ্ণতা আর ভরসা দিচ্ছেন, কালকে সেটাই তাকে বাইরের পৃথিবী থেকে রক্ষা করবে।
বন্ধুত্ব আর অভিভাবকত্ব বিপরীত কিছু নয়, ঠিকমতো ব্যালেন্স করতে পারলে একটা অন্যটাকে আরো গভীর করে তোলে।
৭. সন্তানকে কাছে রাখুন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
কাছে রাখা মানে সারাক্ষণ গোয়েন্দাগিরি বা নজরদারি করা না, এর মানে হলো কানেকশন রাখা। একসাথে ফোন দূরে সরিয়ে রেখে খাবার খাওয়া, স্কুল থেকে ফেরার সময় বাড়িতে থাকা, স্ক্রিনটাইমে তাকে একা না ছেড়ে পাশে বসা। তাদের বন্ধু কারা, মনের ভেতর দুশ্চিন্তা কী, স্বপ্ন কী, ভয় কোথায় এসব খোঁজখবর রাখা।
এমন একটা দুনিয়ায় যেখানে সন্তান পরিবারের চেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে ইউটিউবার আর অ্যালগরিদমের সাথে, সেখানে তাকে কাছে টেনে রাখাটাই আপনার সবচেয়ে সাহসী আর সুন্দর ইসলামিক কাজ।
আপনি তাকে যত কাছে রাখবেন, সন্তান সবরকম ক্ষতি থেকে ততটাই দূরে থাকবে।
৮. ভিত্তিহীন অতিরিক্ত প্রশংসা করবেন না, সত্যিকারের আত্মবিশ্বাস আর অহংকারের তফাত বুঝুন
একবার এক লোক সামনে বসে অন্যজনের অতিরিক্ত প্রশংসা করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন বললেন: “তুমি তোমার সঙ্গীর ঘাড় কেটে ফেললে।” (সহিহ বুখারি)
মিথ্যা প্রশংসা আসলে সত্যিকারের আত্মবিশ্বাস তৈরি করে না, বরং এটা এমন এক ঠুনকো অহংকার তৈরি করে যা জীবনের যেকোনো পরীক্ষায় সহজেই ভেঙে পড়ে।
সঠিক পথটা হলো তার পরিশ্রম আর চেষ্টার প্রশংসা করা । বলুন, “মাশাআল্লাহ, আমি দেখলাম তুমি কাজটায় কত চেষ্টা করেছ”, এমনটা বলবেন না যে “তুমি পৃথিবীর সেরা”।
তার উন্নতিটা স্বীকার করুন, “আজকে তুমি অনেক ধৈর্য ধরেছ, এটা সত্যিই গর্বের।” ভুল ধরুন ভালোবেসে, “চলো আরেকবার চেষ্টা করি, তুমি ঠিকই পারবে।” প্রশংসাকে সব সময় কৃতজ্ঞতার সাথে মেশান, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তোমাকে এই দারুণ ক্ষমতা দিয়েছেন, এটা ভালোভাবে কাজে লাগাও।”
ঠিক এভাবেই তৈরি হয় ইখলাস, ধৈর্য আর বিনয়, যে গুণগুলো আল্লাহর কাছে আসলেও অনেক দামি।
৯. ভালোবেসে কথা বলুন
আমাদের মুখের কথা যেমন ঘা শুকাতে পারে, তেমনি মন ভাঙতেও পারে। আল্লাহ বলেছেন:
“মানুষকে ভালো কথা বলো।” (সূরা বাকারা, ২:৮৩)
আনাস ইবনে মালিক (রা.) দশ বছর বয়স থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সেবা করেছেন। তিনি বলেছেন:
“তিনি কখনো আমাকে ‘উফ’ বলেননি। আমি যা করতাম তা নিয়ে কখনো বলেননি ‘কেন করলে?’ আর যা করতাম না তা নিয়েও বলেননি ‘কেন করলে না?'” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
টানা দশ বছরের এত কাছের সেবা, অথচ একটিও কড়া বা কঠোর কথা নেই। এটাই হলো আমাদের মানদণ্ড।
এর মানে হলো, লজ্জা দেওয়া বা খোঁটা দেওয়া কথাবার্তা আজই বাদ দিতে হবে। “তুমি এত অলস কেন”, “তোমার ভাইয়ের দিকে তাকাও”, এসব বলবেন না। সমালোচনার বদলে তাকে পথ দেখান: “চলো আমরা একসাথে চেষ্টা করি।” নাম ধরে খুব আদরের সাথে ডাকুন। সন্তানের সামনেই তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তাকে শুনতে দিন যে আপনি তার জন্য ভালো কিছুই চাইছেন।
আপনি সন্তানের ব্যাপারে আজ যে কথাগুলো বলছেন, সেটাই একদিন তার ভেতরের নিজের কণ্ঠস্বর হয়ে যাবে। তাই সেই কণ্ঠস্বরকে দয়াশীল, সাহসী আর ঈমানে ভরা হতে সাহায্য করুন।
১০. সন্তানের কাছে বাবারা অনন্য
ইসলামিক প্যারেন্টিংয়ে বাবার ভূমিকা অনেক বড়। ঘরের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব অন্য কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আল্লাহ বলেছেন:
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।” (সূরা তাহরিম, ৬৬:৬)
এই আয়াতটা বিশেষভাবে ঘরের পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলা। বাবা হওয়া মানে শুধু মাসের শেষে খরচ জোগানো নয়, এটা মানে হলো সময় দেওয়া, রক্ষা করা, আর দ্বীনের পথে নেতৃত্ব দেওয়া।
একজন সক্রিয় ও নেক বাবা হলেন তিনি, যিনি মসজিদে জামাতে নামাজ পড়েন আর সন্তানকে সাথে নিয়ে যান। সন্তানকে কোরআন পড়তে বলার আগে নিজে প্রতিদিন পড়েন। যার ঘরে সুন্দর অর্থবহ ইসলামিক আলোচনা হয়। তিনি সন্তানের শুধু জিনিসপত্রই কিনে দেন না, তার মনের আবেগ-অনুভূতিরও খেয়াল রাখেন। তিনি জানেন তার সন্তান অনলাইনে কী করছে, কার সাথে মিশছে, কী দেখছে।
ইসলামিক প্যারেন্টিং আসলে কোনো ধরাবাঁধা কৌশল নয়, এটা একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপনের ধরন। এর ভেতরে আছে আধ্যাত্মিক ভিত্তি, দোয়া, কোরআন আর রাসূল ﷺ এর প্রতি ভালোবাসা। আছে সুন্দর আবেগের কানেকশন, একসাথে সময় কাটানো, ভালোবাসার কথা বলা। আছে আচরণের আয়না, আপনি নিজে যা বলেন সেটাই করে দেখান। আছে ডিজিটাল সচেতনতা বা পরিবেশ নিরাপদ রাখা। আর সবকিছুর সাথে আছে একজন বাবার সক্রিয় উপস্থিতি।
শেষ কথা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয়, আর নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম)
নেক সন্তান যে আপনার জন্য মন থেকে দোয়া করবে। এটাই ইসলামিক প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
শুধু ভালো আচরণের একটা বাচ্চা নয়, বরং এমন কেউ যার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক আপনার চলে যাওয়ার পরেও অটুট থাকবে। যে আপনার সদকায়ে জারিয়া দুনিয়াতে বহন করে চলবে।
ইসলামিক প্যারেন্টিং আপনাকে নিখুঁত হতে বলে না। এটা শুধু বলে, সন্তানের পাশে থাকুন, তার জন্য দোয়া করুন, তাকে ভালোবাসুন এবং সবকিছুর মাঝে একটা সুন্দর ব্যালেন্স রাখুন। আর প্রতিটি পদক্ষেপে সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে যান আল্লাহর দিকে, তাঁর রাসূল ﷺ এর দিকে, এই সুন্দর দ্বীনের চিরন্তন আলোর দিকে।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের দুনিয়ায় আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আখিরাতে আমাদের নাজাতের উসিলা করুন।
আমিন।
