|

সন্তানকে মুমিন হিসেবে গড়ে তুলবেন যেভাবে ।

সন্তান যখন প্রথমবার “আম্মু” বা “আব্বু” বলে ডাকে, সেই মুহূর্তটা কোনো বাবা-মা কখনো ভুলতে পারেন না। তখন থেকেই শুরু হয় একটা নতুন দায়িত্ব। শুধু খাওয়ানোর দায়িত্ব নয়, শুধু স্কুলে পাঠানোর দায়িত্বও নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ মানুষ গড়ে তোলার দায়িত্ব।

আমরা সন্তানের জন্য অনেক কিছুই করি। ভালো স্কুল খুঁজি, প্রাইভেট টিউটর রাখি, কোচিং করাই। কিন্তু সন্তানকে মুমিন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি তো? চিন্তা করে দেখুন তো, আপনার সন্তান কি জানে, সকালে ঘুম থেকে উঠে কী বলতে হয়? খাওয়ার আগে কী বলতে হয়? রাগ হলে কী করতে হয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি “না” হয়, তাহলে এই ব্লগটি আপনার জন্যই লেখা।

আজকে আমরা কথা বলব ইসলামের সেই ছোট ছোট  অভ্যাসগুলো নিয়ে, যেগুলো আপনার সন্তানকে শুধু একজন ভালো মুসলিম নয়, একজন সুন্দর মনের মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই অভ্যাসগুলো গড়ে তোলার সময় এখনই।

একটি বড়ো ভুল ভাবনা

অনেক বাবা-মা বলেন, ” ও তো এখন বাচ্চা, এখন কী বুঝবে? আরেকটু বড় হোক, তারপর শেখাব।” এই কথাটা শুনতে যতটা স্বাভাবিক লাগে, আসলে এটি ততটাই ক্ষতিকর। বলা যেতে পারে তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর ।

ভেবে দেখুন তো, একটি চারাগাছ যখন ছোট থাকে, তখন সামান্য একটু সাহায্যেই তাকে সোজা করে দেওয়া যায়। কিন্তু একবার বড় হয়ে বাঁকা হয়ে গেলে? তখন আর সোজা করা যায় না ।

শিশুও ঠিক তেমনই। ছোটবেলায় সে যা দেখে, যা শোনে, যা অনুভব করে, সেটাই তার ভেতরে গভীরভাবে গেঁথে যায়। এই সময়টাকে বলা হয় চরিত্র গঠনের সোনালি সময়। এই সময়টি একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।

তাই সন্তানকে মুমিন হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে দেরি করা যাবে না । আজ থেকেই শুরু করতে হবে সেই প্রক্রিয়া ।

দোয়া শিক্ষা

সূর্য উঠে স্নিগ্ধ সকালের জানান দেয়। আর সেই সকালটা যদি আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু হয়, তাহলে পুরো দিনটাই হয় সুন্দর, স্নিগ্ধ। তাই সন্তানকে শেখাতে হবে বিশেষ দোয়াগুলো । যেগুলো পদে পদে আল্লাহকে স্মরণ করাবে।

আপনার সন্তানকে ঘুম থেকে ওঠার ও রাতে ঘুমানোর আগের দোয়া, এই দুটো দোয়া প্রথমে শেখান। এরপর অভ্যাস করান । শুরুতে হয়তো সে পুরোটা মনে রাখতে পারবে না, ভুল করবে এবং এটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে আপনি প্রতিদিন তার সাথে দোয়াগুলো পড়ুন। এভাবে কিছুদিনের মধ্যেই এটা তার মুখস্থ হয়ে যাবে।

খাওয়ার আগে “বিসমিল্লাহ” এবং শেষে “আলহামদুলিল্লাহ” বলার অভ্যাসটিও একইভাবে করান। এই দুটো ছোট্ট শব্দ শিশুকে একটি অসাধারণ মূল্যবোধ শেখায়। সে শেখে প্রতিটি নিয়ামতের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। এই কৃতজ্ঞতার অভ্যাস যে শিশু ছোটবেলায় গড়ে তোলে, সে বড় হয়েও জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক থাকতে পারে।

বাথরুমে প্রবেশ এবং বের হওয়ার দোয়া যেহেতু একটু বড়ো তাই এগুলো একটু মজাদার ছন্দের মতো করে শেখান। শিশুরা ছন্দ ভালোবাসে, তাই সহজেই মনে রাখে।

এভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দুয়াগুলোকে তার অভ্যাসে পরিণত করুন । এতে যেকোনো পরিস্থিতে সে আল্লাহর উপর ভরসা করবে এবং জানবে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ।

যে আদবগুলো আজ থেকেই শেখানো উচিত

ইসলাম আমাদের প্রতিটি ছোট বিষয়েও সুন্দর শিষ্টাচার শিখিয়েছে। এই শিষ্টাচারগুলো শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, বরং বাস্তব জীবনেও অত্যন্ত কাজের। তাই এই শিষ্টাচারগুলো সন্তানকে ছোটোবেলা থেকেই শেখাতে হবে। ফলে সে মুমিন হবার পথে একধাপ এগিয়ে যাবে । এক্ষেত্রে রাগচাপ দিয়ে তাকে শেখানো যাবে না । সে ভুল করবে এবং প্রতিবারই সুন্দর মতো তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে ।

ডান হাত দিয়ে খাওয়া, পানি পান করা, জুতো ডান পা থেকে পরা এবং বাম পা থেকে খোলা, এই অভ্যাসগুলো শিশুর মধ্যে একটি সুশৃঙ্খল মনোভাব তৈরি করে। সে শেখে যে, প্রতিটি কাজের একটি সুন্দর নিয়ম আছে। ফলে সে নিয়মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হয়।

হাঁচি দিলে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা এবং অন্য কেউ বললে “ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলে জবাব দেওয়া শেখান। এই ছোট্ট আদানপ্রদানটি শিশুকে শেখায় যে, আশেপাশের মানুষের প্রতি যত্নশীল হতে হয়। তাদের জন্য দুয়া করতে হয় । এবং ইসলাম অন্যের জন্য দুয়া করতে বলে । ফলে অন্য কারও জন্য দুয়া করতে সে কৃপণতাবোধ করে না ।

ঘরে ঢোকার সময় সালাম দেওয়া, সুন্দর কিছু দেখলে “মাশাআল্লাহ” বলা, আয়নায় নিজেকে দেখার সময় দোয়া পড়া  এই অভ্যাসগুলো শিশুর প্রতিদিনের জীবনকে একটি ইবাদতে পরিণত করে। এতে সে বুঝতে শুরু করে যে ইবাদত শুধু নামাজ রোজাই নয় বরং মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই ইবাদত যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয় ।

যা শেখানো সবচেয়ে বেশি জরুরি

আজকের দিনে শিশুরা রাগ করলে বা হতাশ হলে কী করে? অনেক সময় চিৎকার করে, কাঁদে, কিংবা অনেক বাজে শব্দ তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। এই সমস্যার সমাধান ইসলাম অনেক আগেই দিয়ে রেখেছে।

রাগ হলে “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলতে শেখান। অবাক হলে বা ভয় পেলে “সুবহানাল্লাহ” বলতে শেখান। এই অভ্যাসটি শিশুর মুখকে যেমন পরিষ্কার রাখে, তেমনি তার মনকেও শান্ত করে। গবেষণাও বলে, কঠিন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট কোনো শব্দ বা বাক্য বলার অভ্যাস মানুষের রাগ এবং উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এই দুয়াগুলো পড়লে গোনাহ যেমন কমে তেমনি সওয়াবও হবে অনেক! আর এই দোয়া শেখানোর কারণে সওয়াবের একটি অংশ পাবেন আপনিও।

নামাজের সময় হলে সন্তানকে নিজের পাশে ডেকে নিন। সে হয়তো পুরো নামাজ পড়তে পারবে না, পুরোটা বুঝবেও না। কিন্তু বাবা বা মায়ের পাশে জায়নামাজে দাঁড়ানোর এই স্মৃতি তার মনের গভীরে এমনভাবে গেঁথে যাবে, যা বড় হলে তাকে নামাজের দিকে বারবার টেনে আনবে। 

কীভাবে শেখাবেন?

শুধু কী শেখাচ্ছেন তা নয়, কীভাবে শেখাচ্ছেন সেটার উপরও পুরো বিষয়টি নির্ভর করে। তাই শেখানোর বিষয়বস্তুর পাশাপাশি কীভাবে শেখাতে হয় তা জানাও আবশ্যক । যদি ভুলভাবে শেখানো হয় তবে হীতে বিপরীত হতে পারে । এক্ষেত্রে শেখানোর কিছু পদ্ধতি নিচে জানানো হলো- 

নিজে আগে করুন। 

শিশুরা বাবা মাকে অনুকরণ করে বড় হয়। আপনি যদি ডান হাতে খান, ঘরে ঢুকে সালাম দেন, কষ্টে পড়লে আল্লাহকে ডাকেন, তাহলে আপনার সন্তান কোনো শিক্ষা ছাড়াই এগুলো শিখে ফেলবে। এবং ধীরে ধীরে এগুলো তার অভ্যাসে পরিণত হবে । আপনার প্রতিদিনের জীবনটাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষাকেন্দ্র । আপনি কী করেন , কী করেন না তার সবকিছুই সে দেখছে । যেহেতু সন্তান আপনাকেই আইডল মানে তাই আপনার প্রতিটি অভ্যাস সে আত্মস্থ করার চেষ্টা করে । তাই সন্তানকে যা শেখাতে চান তা নিজের মাঝে নিয়ে আসুন।

ধমক না দিয়ে কারণ বলুন। 

“এটা করো” না বলে বলুন কেন করতে হবে। “ঘুমানোর আগে দোয়া পড়লে ফেরেশতারা সারারাত তোমাকে পাহারা দেয়” বা “ডান হাতে খেলে আল্লাহ অনেক খুশি হন” এভাবে বয়স অনুযায়ী বুঝিয়ে বললে সে শুধু কাজটা করে না, কাজটাকে মন থেকে ভালোবাসতে শেখে। মনে রাখতে হবে শুধু রাগ দেখালে কাজটাই হাসিল হবে । কিন্তু বুঝিয়ে বললে সে তো কাজটা করবেই পাশাপাশি কাজটাকে ভালোও বাসবে।

ভুলে গেলে হাসিমুখে মনে করিয়ে দিন।

 বাচ্চারা ভুলবে, এটাই তাদের স্বভাব। বাম পায়ে জুতো পরে ফেললে রেগে না গিয়ে হাসিমুখে বলুন, “আরে, জুতোটা ভুল পায়ে চলে গেছে মনে হচ্ছে!” এভাবে বললে সে ভয় না পেয়ে হাসতে হাসতে শুধরে নেবে এবং ধীরে ধীরে বিষয়টা তার মনের ভেতরে থাকতে শুরু করবে। এভাবে করলে আপনার প্রতি তার শ্রদ্ধার জায়গাতো থাকবেই এমনকি সে আপনাকে বিশ্বস্ত সঙ্গীও ভাবতে শুরু করবে । যেটা প্যারেন্টিংয়ের জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট।

ভালো কাজের প্রশংসা করুন

 যখনই সে নিজে থেকে কোনো সুন্নাহ পালন করবে, সঙ্গে সঙ্গে তার কাজের প্রশংসা করুন। কিংবা তার পছন্দের ছোট্ট কোনো পুরস্কার দিতে পারেন। তবে সবসময় নয়। এই ছোট্ট স্বীকৃতিটুকু তাকে বারবার ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে। কেননা সে বুঝবে যে বাবা মা তার কাজের কদর করে ।

শেষ কথা

আমরা সন্তানের জন্য অনেক কিছুই রেখে যেতে চাই। সম্পদ রেখে যেতে চাই, বাড়ি রেখে যেতে চাই। কিন্তু দুনিয়ার কোনো সম্পদই সেই উপহারের সমতুল্য নয়, যে উপহার একটি শিশুর ভেতরে ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠে।

ইসলামের এই সুন্দর অভ্যাসগুলো যদি ভালোবাসা দিয়ে, হাসিমুখে, গল্পের ছলে শিশুর মধ্যে গড়ে দেওয়া যায়, তাহলে সে বড় হয়ে কোনোদিন ইসলামকে বোঝা মনে করবে না। বরং প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে এই অভ্যাসগুলোই তাকে শক্তি দেবে, পথ দেখাবে, আর আল্লাহর কাছের করে রাখবে।

আর এই কাজটি আপনি ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না। কোনো স্কুল নয়, কোনো মাদ্রাসা নয়, কোনো ইউটিউব ভিডিও নয়। শুধু আপনি, তার বাবা বা মা।

আল্লাহ আমাদের সকলকে নেক সন্তান গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন। আমীন।

Similar Posts